Skip to Content


৪৮-৭২ ঘন্টায় ক্যাশ অন ডেলিভারি। ০১৬১৫-৮৩১৬৩৮

রবের পথের অন্তরায়

আল্লাহর হুকুম মেনে চলার পথে মানুষের নিকট যেসব অন্তর বাঁধা বিপত্তি এসে দাঁড়ায় তাসাউফের ভাষায় তাকে হিজাব (পর্দা) বলা হয়।

হিজাব বা অন্তরায় দু’প্রকার। যথা:

১. রাইনি হিজাব; ২. গাইনি হিজাব।

রাইনি হিজাব

রাইনি হিজাব এক ধরনের সুদৃঢ় অন্তরায়- যা কখনও অপসারণ হয় না। কারণ তা সম্পৃক্ত হয়ে যাওয়ার পর ব্যক্তির অন্তরে সিল পড়ে যায় এবং দাগ লেগে যায়। রাইন (রং লাগা) খাতাম (সিল পড়া) তাবায়া (দাগ লাগা) এই তিনটি শব্দকে একই অর্থে কুরআন মাজিদে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন। যেমন আল্লাহ বলেন-

إِذَا تُتْلَى عَلَيْهِ آيَاتُنَا قَالَ أَسَاطِيرُ الْأَوَّلِينَ - كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ

অনুবাদ: যখন তাদের নিকট আমার আয়াত পাঠ করা হয় তখন তারা বলে থাকে রাখ এটাতো পৌরাণিক কেচ্ছা কাহিনি। কখনও নয় বরং তাদের অপকর্মসমূহ রঞ্জিত হয়ে তাদের অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে গেছে। (সুরা মুতাফিফিন, আয়াত নং: ১৪)

অপর আয়াতে এরশাদ করেন:

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا سَوَاءٌ عَلَيْهِمْ أَأَنْذَرْتَهُمْ أَمْ لَمْ تُنْذِرْهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ - خَتَمَ اللهُ عَلَى قُلُوبِهِمْ وَعَلَى سَمْعِهِمْ وَعَلَى أَبْصَارِهِمْ غِشَاوَةٌ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ-

অনুবাদ: যারা (যথার্থতাকে) মান্য করতে অস্বীকার করে তাদের ভয় প্রদর্শন করা হোক কিংবা না হোক তা তাদের জন্য একই সমতুল্য, তারা তাকে বিশ্বাস করবে না। আল্লাহ তাদের অন্তরে সীলমোহর অঙ্কিত করে দিয়েছেন এবং তাদের চোখে পর্দা পড়ে গেছে। তাদের জন্য মর্মান্তিক আজাব রয়েছে।” (সুরা আল বাকারা: ৬-৭)

এই সম্পর্কেই অন্য আয়াতে বলেন:

فَبِمَا نَقْضِهِمْ مِيثَاقَهُمْ وَكُفْرِهِمْ بِآيَاتِ اللهِ وَقَتْلِهِمُ الْأَنْبِيَاءَ بِغَيْرِ حَقٍّ وَقَوْلِهِمْ قُلُوبُنَا غُلْفٌ بَلْ طَبَعَ اللهُ عَلَيْهَا بِكُفْرِهِمْ فَلَا يُؤْمِنُونَ إِلَّا قَلِيلًا-

অনুবাদ: তাদের ওয়াদা ভঙ্গের দরুন এবং এই জন্য যে তারা আল্লাহর আয়াতকে মিথ্যা বলেছে এবং বহুনবিকে অযথা হত্যা করেছে। আরও বলে আমাদের অন্তর গেলাফে সংরক্ষিত (অন্তঃকরণকে সংরক্ষিত বলা না।) বরং তাদের অর্থহীন বস্তুকে উপাসনা করার কারণে আল্লাহ তাদের অন্তঃকরণে ছাপ মেরে দিয়েছেন। তাদের মধ্যে খুব কম সংখ্যক লোকই ঈমান গ্রহণ করে।” (সুরা: আন্-নিসা: ১৫৫)

উক্ত আয়াতসমূহে আল্লাহ যাদের কথা উল্লেখ করেছেন তাদের অন্তরেই আল্লাহ তায়ালা রাইনি পর্দা টেনে দিয়েছেন। কিন্তু লোকের কৃতকার্যের কারণেই ঐ জাতীয় পর্দার সৃষ্টি হয়ে থাকে। এমন নয় যে তারা সঠিক পথের অনুসন্ধানী ছিল। অথচ আল্লাহ তাদের উক্ত পথ পাওয়া হতে বঞ্চিত করেছেন।

তাই আল্লাহ তায়ালা এই প্রসঙ্গে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন-

فَلَمَّا زَاغُوا أَزَاغَ اللهُ قُلُوبَهُمْ وَاللهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ

অনুবাদ: যখন তারা নিজেরাই হীনতা অবলম্বন করেছে তখন আল্লাহও তাদের অন্তরকে বক্র করে দিয়েছেন। (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত নং: ৫)

আল্লাহর নিয়ম নয় যে, অসৎ পথের পথিককে জোর জবরদস্তি করে হেদায়াত করেন। অথচ যারা স্বেচ্ছায় ও সরলান্তঃকরণে হেদায়াতপ্রাপ্ত হতে চায় আল্লাহ অবশ্য তাদের সঠিক পথপ্রাপ্ত করেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন- “সত্যের সন্ধানীকে আল্লাহ সঠিক পথ প্রদর্শন করেন।”

আরও বলেন-

وَمَا يُضِلُّ بِهِ إِلَّا الْفَاسِقِينَ - الَّذِينَ يَنْقُضُونَ عَهْدَ اللهِ مِنْ بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللهُ بِهِ أَنْ يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ أُولَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ

অনুবাদ: যারা ফাসেক, যারা আল্লাহর ওয়াদাকে মজবুতভাবে আঁকড়িয়ে ধরার পর বিচ্ছিন্ন করে দেয় আল্লাহ তাদেরই গোমরাহীতে নিমজ্জিত করেন। আল্লাহ যেই সম্পর্ককে সুদৃঢ় করার আদেশ দিয়েছেন তারা তাকে বিচ্ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে বিবাদ বিসম্বাদের সৃষ্টি করে।” (সুরা আল বাকারা: ২৬-২৭)

এই সম্পর্কে আল্লাহর নীতি হলো-

وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا

অনুবাদ: যারা আমার পথে সাধনা করে নিশ্চয় তাদের আমি আমার পথ প্রদর্শন করি। (সুরা আল আনকাবুত-৩৬)

বরং এই সম্বন্ধে আল্লাহর মেহেরবানি এবং অনুকম্পা এতই যে যেই ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখে তিনি তাদের অন্তঃকরণকে সঠিক পথ দেখান।

এর চেয়ে আর কী অনুগ্রহ হতে পারে যে আল্লাহ তার কিতাবকে সর্বদিক হতে সংরক্ষণ করে মানবজাতির হাতে সমর্পণ করে বলেছেন:

অনুবাদ: এটি আল্লাহর গ্রন্থ তাতে কোন ধরনের সন্দেহ নেই। এটি পরহেজগারদের পথ প্রদর্শন করে। (সুরা আল বাকারা- ২)।

নবি করিম  ইরশাদ করেছেন: মানুষ যখন কোন অন্যায় করে তখন সেই কৃত কাজের ফলে তার অন্তরে একটি কাল দাগ পড়ে যায় । অতপর সে যদি উক্ত পাপ থেকে তওবাহ করে এবং ভবিষ্যতে কোন পাপ কাজ করা হতে বিরত থাকে তখন অন্তঃকরণ পরিষ্কার হয়ে যায়। নতুবা সেই দাগ বাড়তে বাড়তে সমস্ত অন্তঃকরণকে ঘিরে ধরে এবং কালো করে ফেলে। সুতরাং এর প্রতিষেধক সত্যিকারের তওবাহ।


গাইনি হিজাব

অপরদিকে গাইনি হিজাব রাইনি হিজাবের বিপরীত। এটা এক প্রকার সাময়িক হিজাব। মানুষ কিছুটা পরিশ্রম করলে এবং আল্লাহর দিকে ধাবিত হলেই এই বাঁধা দূর হয়ে যায়। যেমন উপরে বর্ণিত আয়াতে প্রকাশিত হয়েছে। এই জাতীয় অন্তরায় কমবেশি সবার মধ্যেই হয়ে থাকে। তা অপসারণ করার নিয়ম হলো মানুষের সত্যিকারের আল্লাহর প্রতি মনোনিবেশ করা। তার জানামতে যেসব কাজ দ্বারা আল্লাহর নাফরমানী করা হয় তা বর্জন করা। আল্লাহ যা কিছু ফরজ করেছেন এবং যা তার পছন্দনীয় তা দায়িত্বসহকারে পালন করা। নতুবা এটা সকলেরই জানা যে যেই ব্যক্তি সত্যের সন্ধানী না হয়, তাকে সন্ধান করার দরকার মনে না করে এবং তা। পাওয়ার জন্য শ্রমবিমুখ হয়; সে কীভাবে হেদায়াতপ্রাপ্ত হতে পারে? যে ব্যক্তি স্বীয় অসুস্থতা সম্বন্ধে উদাসীন তার পরিণতি সম্বন্ধে অজ্ঞ এবং বাড়ির সম্মুখে হাসপাতাল থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসা না করায় তবে তার পরিণতি কী হতে পারে?

তাই আল্লাহ তায়ালা বলেন-

كَيْفَ يَهْدِي اللهُ قَوْمًا كَفَرُوا بَعْدَ إِيمَانِهِمْ وَشَهِدُوا أَنَّ الرَّسُولَ حَقٌّ وَجَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَاللهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ

অনুবাদ: ঐ সকল লোকদের আল্লাহ তায়ালা কীভাবে হেদায়াত দান করবেন যারা ঈমান গ্রহণ করার পর কুফরীতে লিপ্ত হয়। অথচ সে সাক্ষ্য প্রদান করেছে যে। রাসূল সত্য সব কিছুই তার কাছে প্রকাশ লাভ করেছে। এমন অত্যাচারী লোকদের আল্লাহ সঠিক পথ দেখান না। (সুরা: আলে-ইমরান- ৮৬)।

তাই ইমানের নেয়ামত ও ধর্মের পথপ্রাপ্ত হওয়ার পর উদাসীন থাকা এবং আল্লাহর আজ্ঞানুবর্তীকে গ্রহণ না করা মানুষের পক্ষে খুবই মর্মান্তিক কাজ। মানুষ যদি তার এই অবস্থার পরিবর্তন সাধনে যত্নবান না হয় তাহলে তার জন্য সন্দেহজনক যে তার এই গাইনি হিজাব রাইনি হিজাবে পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে।

এই দ্বিবিধ হিজাবের পার্থক্য এরূপ ভাবুন যে একটি প্রকৃতপক্ষেই পাথর যা কখনও আয়না হতে পারে না। দ্বিতীয়টি মূলত আয়না। মরিচা ধরেছে। একটু ঘষা মাজা করলেই ঠিক হয়ে যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে যে যেই হৃদয় পাথরের আকৃতি ধারণ করে আল্লাহ তাকে জোরপূর্বক পাথরে পরিণত করেন না। বরং মানুষ নিজে এমন পথের অনুসারী হয় যেই পথ উক্ত অবস্থায় পরিণত করে। নতুবা যথার্থতা তো এই যে-

“সকল শিশুই ইসলামের প্রকৃতির উপর জন্মগ্রহণ করে।” (মুয়াত্তা ইমাম মালেক)

কুরআনের বিশেষ পবিত্র সাতান্নটি নাম