দীন গ্রহণের সাথে সাথেই ব্যক্তি মুমিন হয়ে ওঠেন না। মুমিন হবার তরে বেশ কিছু কায়দা আছে। সেসবের দ্বারা যেমন রবের নৈকট্য হাসিল করা যায় তেমনি পূর্ণতা সাধন হয়। মুমিন সবকিছুতে আল্লাহকেই পেতে চাইবে। মালিকের প্রেমে সর্বদা ডুবে থাকবে। আর মুমিনের জন্য রাত হলো নিজেকে একদম উজাড় করে দেবার মুখ্যম সময়। রাত আল্লাহর সৃষ্টির এক বড় নিদর্শন। একে আল্লাহ মানুষের আরাম-আয়েশ ও প্রশান্তির উপায় হিসাবে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ রাতকে মানুষের জন্য আবরণ বা আড়াল হিসেবেও সৃষ্টি করেছেন।
রাতের বিশেষগুণ বর্ণনায় বলতে হয়, আল্লাহ তায়ালা মাহবুব নবিকে রাতেই নিজের কাছে পরিভ্রমণ করিয়েছেন। কুরআনের ভাষায় মেরাজ। আর পথপ্রদর্শনকারী কুরআনও ধরণিতে রাতের বেলায় আগমন করেছে। আর বান্দাকে যখন একটু বেশি ভালোবাসা দিতে ইচ্ছে হয় তখন প্রভূ রাতের শেষ অংশে প্রথম আসমানে নেমে আসেন। রাত বড়ই রহস্যময়।
রাতের পবিত্রতা: নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামার অন্যতম একটি সুন্নাহ রাতে ঘুমানোর আগে পরিস্কার ও পরিচ্ছন্ন হওয়া। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিসে বলেছেন, “যে ব্যক্তি ওজু করে শুবে তার পরিহিত কাপড়ের মধ্যে একজন ফেরেশতা রাত্রি যাপন করেন। জাগ্রত হবার পর ফেরেশতা অজুকারী ব্যক্তির জন্য মাগফেরাত কামনা করে।” [হাদিসখানা আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. হতে বর্ণিত, সহিহ ইবনে হিব্বান- ১০৫১ নং হাদিস]
রাতের বেলা কখনো জাগ্রত হয়ে গেলে দুই হাত ও মুখমণ্ডল ধৌত করা সুন্নাহ। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, “রাতের বেলা জাগ্রত হলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাজায়ে হাজত পড়তেন। নামাজের পর হাত মুখ ধুয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়তেন।” [সহিহ মুসলিম- ৩০৪ নং হাদিস]
অপবিত্র ব্যক্তি প্রথমে লজ্জাস্থান ধুয়ে এবং ওজু করে ঘুমাবে। হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব রা. রাতে অপবিত্র হওয়ার কথা নবিজির নিকট বললেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনাকে বললেন, ‘ওজু কর ও লজ্জাস্থান ধৌত কর। অতঃপর ঘুমিয়ে যাও। [সহিহ মুসলিম- ৩০৬ নং হাদিস]
ঘুমানোর পদ্ধতি ও আদব: আল্লাহ তায়ালা রাততে প্রশান্তিময় করে সৃষ্টি করেছেন। যেনো বান্দারা নিজেকে প্রশান্ত করতে পারে। ইবাদত ও বন্দেগির পাশাপাশি রাতে ঘুমাতেও হবে। তবে কিছু তরিকা অবলম্বন করলে ঘুমটিকেও ইবাদতে রুপান্তর করা যাবে। যেমন-
ডান কাতে শুয়া: আর শয়নকালে ডান কাতে শয়ন করা সুন্নাত। [সহিহ বুখারি- ২৪৭ নং হাদিস] দো‘আ পাঠ : ঘুমানোর আগে ও পরে দুআ পাঠ করতে হবে। সুরা তেলাওয়াত : ঘুমানোর সময় সুরা ইখলাছ, সুরা মূলক, নাস ও ফালাক তেলাওয়াত করা সুন্নাত। আয়াতুল কুরসি তেলাওয়াত : কুরআনের সর্বাধিক মর্যাদা সম্পন্ন আয়াত হচ্ছে আয়াতুল কুরসি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘ঘুমানোর সময় আয়াতুল কুরসি পাঠ করো। এর ফলে রবের পক্ষ হতে রক্ষার ফেরেশতা পাঠকারীর জন্য পাহাড়াদার হয়। শয়তান কাছেও ঘেষতে পারে না। [সহিহ বুখারি-৩২৭৫ নং হাদিস]
রাতের নামাজ: মাগরিব ও ইশা ছাড়া রাতে তাহাজ্জুদ ও কিয়ামুল লাইল করা যায়। কেননা নফল নামাজ হলো আল্লাহ পাকের নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম। নবিজি তাহাজ্জুদকে আব্যিশক করে দিতে দিতেন। শুধু উম্মতের কষ্টের কথা বিবেচনা করে দেননি। আবু উমামা রা. বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- ‘তোমাদের জন্য কিয়ামুল লাইল বা রাতের নামাজ আদায় করা উচিত। রাতে ইবাদত করা হচ্ছে তোমাদের পূর্ববর্তী নেক লোকদের রীতি। তোমাদের জন্য তোমাদের প্রতিপালকের নৈকট্য লাভের পন্থা, গুনাহ মাফের উপায় এবং অপরাধ, অশ্লীলতা হ’তে বিরত থাকার মাধ্যম’। [মিশকাত, হাদিস নং-১২২৭]
রাতের জিকির আজকার : জিকিরের মাধ্যমে কলব পরিস্কার ও প্রশান্তি লাভ করে। জিকির এমন বিষয় যা অন্তরকে পরিশুদ্ধ করতে সহায়তা করে। রাত নির্জনতার প্রতীক। নিজের জন্য একান্ত সময় রাত। এই মালিকের সুন্দর সুন্দর নাম ধরে ডাকা যায়। যেখানে আপনি ডাকবেন আর আল্লাহ শুনবেন। এতে করে খুব সহজেই মালিকের প্রিয়পাত্র তথা মুমিন হওয়া যায়।
রাতে দোআ ও ইস্তেগফার : রাতে এমন কিছু মুহূর্ত রয়েছে, যখন আল্লাহর দরবারে দোআ করলে, তা কবুল হয়। এজন্য রাতে জেগে আল্লাহর নিকটে দো‘আ করা ও ক্ষমা প্রার্থনা করা জরুরি। আবু হুরাইরা রা. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আমাদের প্রতিপালক প্রত্যেক রাতেই নিকটবর্তী আকাশে অবতীর্ণ হন, যখন রাতের শেষ তৃতীয় ভাগ অবশিষ্ট থাকে এবং বলতে থাকেন, কে আছে যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দিব। কে আছে যে আমার নিকট কিছু চাইবে, আমি তাকে তা দান করব এবং কে আছে যে আমার নিকট ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব’। [সহিহ বুখারি- ১১৪৫ নং হাদিস] অন্যত্র রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘রাত্রের মধ্যে এমন একটি সময় আছে, যদি কোন মুসলমান সে সময় লাভ করতে পারে এবং আল্লাহর নিকট ইহকাল ও পরকালের কোন কল্যাণ চায় আল্লাহ তাকে তা দান করেন। আর এই সময়টি প্রত্যেক রাতেই রয়েছে’। [সহিহ মুসলিম- ৭৫৭ নং হাদিস]
রাতের আমলের পরিসমাপ্তি : ফজরের ছালাত আদায়ের মাধ্যমে রাতের আমলের পরিসমাপ্তি ঘটে। ফজরের নামাজ আদায় না করলে মানুষ কলুষিত অন্তর নিয়ে জাগ্রত হয়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমাদের কেউ যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন শয়তান তার ঘাড়ের পেছনে তিনটি গিঁট দেয়। প্রতি গিঁট সে এ বলে চাপড়ায়, তোমার সামনে রয়েছে দীর্ঘ রাত। অতএব তুমি শুয়ে থাক। অতঃপর সে যদি জাগ্রত হয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে তাহ’লে তার একটি গিঁট খুলে যায়। পরে ওজু করলে আরেকটি গিঁট খুলে যায়। অতঃপর নামাজ আদায় করলে আরেকটি গিঁট খুলে যায়। তখন তার প্রভাত হয় প্রফুল্ল মনে ও নির্মল চিত্তে। অন্যথা সে সকালে উঠে কলুষিত মনে ও অলসতা নিয়ে’। [সহিহ বুখারি- ১১৪২ নং হাদিস]
এভাবেই যাপিত হয় মুমিনের রাত। যা অন্যসব রাতের চেয়ে ভিন্ন ও বরকতময়। যেখানে রয়েছে চরম আনুগত্য আর শৃঙ্খলার এক অনন্য উদাহরণ। মালিক মুমিন হবার তওফিক দিন। আমিন ইয়া রব।