কুরআনের প্রতিটি আয়াতে যেমন রয়েছে বিশ্বমানবতার হেদায়াত ও মুক্তির বারতা তেমনি কুরআন তিলাওয়াতে রয়েছে বিশ্বাসীদের জন্য অফুরান সওয়াব ও পুরস্কারের ঘোষণা।
তিলাওয়াত অর্থ আবৃত্তি বা পাঠ করা, অনুধাবন ও অনুসরণ করা। আল-কুরআন পাঠ করাকে ইসলামি পরিভাষায় কুরআন তিলাওয়াত বলা হয়। কুরআন তিলাওয়াত ইবাদতের অন্যতম অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। নামাযের মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত রয়েছে যা কুরআন তিলাওয়াত ছাড়া সম্ভব হয় না। সাধারণ ইবাদত হিসেবেও কুরআন তিলাওয়াতের অনেক গুরুত্ব ও ফজিলত রয়েছে। আল্লাহর বিশেষ সান্নিধ্য লাভের যেসব সুযোগ রয়েছে, সেগুলোর অন্যতন হচ্ছে কুরআন তিলাওয়াত। প্রয়োজনীয় সব বিধান ও মূলনীতিই এখানে রয়েছে।
- আল্লাহর সঙ্গে কথা বলার মাধ্যম কুরআন তিলাওয়াত : হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উম্মতের শ্রম কম আর সম্মানী বেশি। এ উম্মতকে আল্লাহ তায়ালা কালামুল্লাহ বা আল কুরআন দান করেছেন যা স্বয়ং আল্লাহর কথা। হজরত মুসা (আ.) আল্লাহর সঙ্গে কথা বলতেন তবে তা ছিল নির্ধারিত সময়ে। আর এ উম্মতের জন্য যখন খুশি আল্লাহর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ রয়েছে। হজরত আলী (রা.) বলেন, ‘আমার যখন মন চাইত আল্লাহর সঙ্গে কথা বলব, তখন কুরআন তেলাওয়াত শুরু করে দিতাম।’
- কুরআন খতমের সহজ পদ্ধতি : রমজান মাস ছাড়া কুরআন খতম করে এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। অথচ কেউ চাইলে প্রতি দু’মাসে অন্তত একবার হলেও কুরআন খতম করতে পারে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আগে ও পরে দেড়-দু পৃষ্ঠা করে চাইলেই পড়া যায়। এতে সময়, দশ মিনিটের বেশি লাগবে না। প্রতি ওয়াক্তে আপনি মাত্র দু’পৃষ্ঠা করে পড়লেও দিনে এক পারা পড়া হয়ে যায়। এভাবে পড়লে প্রতি মাসে খতম করা খুবই সহজ। এ ছাড়া আমরা কাজের সময় মনে মনে মুখস্থ ছোট ছোট সূরাগুলো পড়তে পারি। অফিসে যাওয়ার সময় গাড়িতে কোনো কাজ থাকে না তখনো চাইলে মুখস্থ সূরাগুলো পড়তে পারি সম্ভব হলে দেখে দেখেও পড়তে পারি।
- কুরআন তিলাওয়াতে ১০ গুণ সওয়াব : মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব থেকে একটি অক্ষর তিলাওয়াত করবে, বিনিময়ে সে একটি নেকি পাবে, আর একটি নেকির বদলা হবে দশগুণ, এ কথা বলছি না যে, আলিফ-লাম-মিম, একটি অক্ষর বরং আলিফ একটি অক্ষর, লাম একটি অক্ষর, মিম একটি অক্ষর (তিরমিজি-২৯১)। কুরআনের একটি অক্ষর পড়লে সর্বনিম্নে ১০টা নেকি মেলে। সূরা ফাতিহা আমাদের সবারই মুখস্থ। আমরা আমাদের কর্মব্যস্ততার মাঝেও সূরা ফাতিহা পড়তে পারি। এতে কাজকর্মের মোটেও ব্যাঘাত ঘটে না। অতি সহজে বহু সওয়াবের ভাগি হওয়া যায়। এমন সহজ সুযোগ কারও হাতছাড়া করা ঠিক নয়।
- কবরের আজাব থেকে মুক্তি : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন, যখন মানুষকে কবরে দাফন করা হয় তখন ফেরেশতা মাথার দিক থেকে আজাব দেওয়ার জন্য আসে, তখন কুরআন তাকে বাধা দেয়। যখন ফেরেশতা সামনের দিক থেকে আসে, তখন দান-সদকা তাকে বাধা দেয়। যখন ফেরেশতা পায়ের দিক থেকে আসে, তখন মসজিদে পায়ে হেঁটে যাওয়া তাকে বাধা দেয়।
- কুরআন তিলাওয়াতকারীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য : আবু মুসা আল আশ’আরি (রা.) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কুরআন তিলাওয়াত করে তার উদাহরণ হলো লেবুর মতো তার স্বাদও ভালো আবার ঘ্রাণও ভালো। মুমিনের উদাহরণ হলো খেজুরের মতো, তার স্বাদ ভালো কিন্তু কোনো ঘ্রাণ নেই, আর কুরআন তিলাওয়াতকারী পাপী ব্যক্তির উদাহরণ হলো ফুলের মতো ঘ্রাণ ভালো কিন্তু স্বাদ তিক্ত, আর যে কুরআন তিলাওয়াত করে না এমন হাফেজের উদাহরণ হলো মাকাল ফলের মতো যার স্বাদ তিক্ত এবং সুগন্ধ নেই।’ (সহিহুল বুখারি, হাদিস : ৭৫৬০)
- কুরআন তিলাওয়াতে দরিদ্রতা দূর হয় : বহু মানুষের পরীক্ষিত আমল সূরা ইখলাস। এ সূরা সবারই মুখস্থ আছে। বেশি বেশি পড়লে রাব্বুল আলামিন অভাব মোচন করে দেবেন। সাহল ইবনে সায়েদি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে দারিদ্র্যের অভিযোগ করল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন, যখন তুমি ঘরে যাও তখন সালাম দেবে এবং একবার সূরা ইখলাস পড়বে। সাহাবি লাগাতার ক’দিন আমল করেন। ফলে কিছু দিনের মধ্যে তার দারিদ্র্য দূরীভূত হয়ে যায়। [কুরতুবি : ২০/১৮৫]
- আল্লাহর নির্দেশ: কুরআন তিলাওয়াতের জন্য আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, তোমার প্রতি কিতাবের যা ওহি হয়েছে তা তিলাওয়াত করো। (সুরা আল-আনকাবুত: ৪৫) আরো বলা আছে, পড় তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন (সুরা আলাক; ১)
সহিহ-শুদ্ধভাবে কুরআন তিলাওয়াত করার জন্য আল্লাহর সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। তিনি বলেছেন, আর তুমি সুবিন্যস্ত ও স্পষ্টভাবে কুরআন তিলাওয়াত করো। (সুরা মুযযামমিল: ৪)
অবশ্য তিলাওয়াতের জন্য তিনি কোনো পরিমাণ নির্ধারণ করে দেননি। বরং তাঁর অপার অনুগ্রহের নিদর্শন রেখে নির্দেশনা দিয়েছেন। যেমন- আল্লাহ বলেন, কাজেই কুরআনের যতটুকু তিলাওয়াত করা সহজ তোমরা ততটুকু তিলাওয়াত কর। (সুরা মুযযামমিল: ২০) - জ্ঞানভাণ্ডার: কুরআন মাজিদ সকল প্রকার জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাণ্ডার। অতীত জাতির ইতিহাস, বর্তমান ঘটনা বিশ্লেষণ এবং নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষেত্রে কুরআন সর্বতোভাবে নির্ভুল উৎস। আইন, বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য প্রতিটি বিষয়েই কুরআন নীতিনির্ধারক গ্রন্থ। এমন কোনো বিষয় নেই যার তথ্য কুরআন মাজিদে পরিবেশিত হয়নি। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন – “আর আমি তোমার ওপর কিতাব নাজিল করেছি, যাতে সব বিষয়ের বিবরণ সন্নিবেশিত হয়েছে”। (সুরা আন-নাহল; ৮৯)
- শান্তি ও রহমত লাভ: নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত ব্যক্তির মনে প্রশাস্তি এনে দেয়। মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই কোনো বিপদে বা শঙ্কায় পতিত হতেন তখনই তিনি কুরআন তিলাওয়াত করতেন। তাছাড়া এ মহাগ্রন্থের তিলাওয়াতে আল্লাহর রহমত লাভ করা যায়। এ প্রসঙ্গে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, "কোনো জাতি বা গোষ্ঠী যখন আল্লাহর ঘরসমূহের কোনো একটি ঘরে সমবেত হয়ে আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে, পরস্পরের মধ্যে এর শিক্ষা অনুশীলন করে, তাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হয়। আল্লাহর রহমত তাদের বেষ্টন করে রাখে, ফেরেশতারা তাদের ঘিরে রাখে এবং আল্লাহ তায়ালা তার নিকটস্থ ফেরেশতাদের কাছে তাদের কথা উল্লেখ করেন" (সহিহ মুসলিম)
- সর্বোত্তম নফল ইবাদত: আল-কুরআনের তিলাওয়াত নফল ইবাদতসমূহের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, "আমার উম্মতের সর্বাধিক ফজিলতপূর্ণ ইবাদত হচ্ছে কুরআন পাঠ (বায়হাকি)।
ইমাম আযম আবু হানিফা (র) বলেন, "আমি সত্তর বার স্বপ্নযোগে নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেছি, সর্বোত্তম নফল ইবাদত কোনটি? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিবারই বলেছেন, কুরআন তিলাওয়াত"। - মর্যাদালাভ: কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে তিলাওয়াতকারী, তার পরিবার এমনকি তার সমাজও মর্যাদালাভ করে। নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমাদের মধ্যে উত্তম লোক সে, যে নিজে কুরআন শিখে এবং অন্যকে তা শিক্ষা দেয় (বুখারি ও মুসলিম)।
- জান্নাত ও শাফায়াতের মর্যাদালাভ: কুরআন তিলাওয়াত ব্যক্তিকে পরকালে জান্নাতলাভ এবং অন্যদের জন্য সুপারিশ করার মর্যাদা এনে দেয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন - "যে ব্যক্তি কুরআন তিলাওয়াত করে, তা মুখস্থ করে এবং হালালকে হালাল ও হারামকে হারাম জানে আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং তার আত্মীয়-স্বজনের মধ্য থেকে এমন দশ ব্যক্তির জন্য তার সুপারিশ কবুল করবেন যাদের প্রত্যেকের জন্যই জাহান্নাম নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল (সুনান আত-তিরমিযি)।
- সওয়াবলাভ: কুরআন মাজিদ আল্লাহর কালাম। পবিত্রতম এ কালামের তিলাওয়াতও তাই সওয়াব লাভের এক বিশেষ মাধ্যম। এ প্রসঙ্গে নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন - "যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি হরফ তিলাওয়াত করে, সে একটি নেকি পায় আর এ প্রত্যেকটি নেকি দশটি নেকির সমান (সুনান আত-তিরমিযি)।
- আল্লাহর সাথে বাক্যালাপ: কুরআন মাজিদ আল্লাহর বাণী। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ জন্যই বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে কেউ যদি আল্লাহর সাথে কথা বলতে চায়, সে যেন বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করে" (সহিহ মুসলিম)
- কুরআনের সুপারিশ: এ মর্মে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেন –তোমরা কুরআন মাজিদ তিলাওয়াত করো। কারণ কিয়ামতের দিন তা স্বীয় তিলাওয়াতকারীর মুক্তির জন্য সুপারিশ করবে। (সহিহ মুসলিম)
নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, "সাওম ও কুরআন বান্দাদের শাফায়াত করবে। কুরআন বলবে, 'হে আল্লাহ! আমি তাকে রাতের শয্যা গ্রহণ করতে বিরত রেখেছি; তার জন্য আমি সুপারিশ করছি, আমার শাফায়াত কবুল করো। অতঃপর উভয়ের শাফায়াত কবুল করা হবে"। (মুসনাদে আহমদ) - আত্মিক পবিত্রতা লাভ: কুরআন তিলাওয়াত ব্যক্তির অন্তরের কলুষ-কালিমা বিদূরিত করে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- "নিশ্চয়ই এ অন্তরেও মরিচা পড়ে, যেমন পানি পড়লে লোহায় মরিচা পড়ে। বলা হলো, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মরিচা দূর করার উপায় কী? তিনি বললেন, বেশি বেশি মৃত্যুকে স্মরণ করা এবং কুরআন তিলাওয়াত করা (মিশকাত)।
- শুদ্ধ তিলাওয়াতের গুরুত্ব: আল্লাহ তায়ালা আল-কুরআনের শুদ্ধ তিলাওয়াতের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেছেন – “আর তুমি সুবিন্যস্ত ও স্পষ্টভাবে কুরআন তিলাওয়াত করা।” (সুরা মুযযাম্মিল: ০৪)।
এজন্য কুরআনের যথাযথ তিলাওয়াত অনিবার্য। কেননা, আনাস ইবনে মালিক (রা.) হতে বর্ণিত - "এমন অনেক কুরআন পাঠক আছে, যারা কুরআন তিলাওয়াত করে আর কুরআন তাদের অভিশাপ দেয়"। (ইমাম গাযযালির এহইয়ায়ে উলুমুদ্দীন)
তিনি আরও বলেন, "যে ব্যক্তি সুললিত কণ্ঠে তিলাওয়াত করে না, সে আমার নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়"। (সুনানে আবু দাউদ) - কুরআন তেলাওয়াতকারীদের পৃথিবীতে আল্লাহ তায়ালা নিম্নোক্ত চারটি নিয়ামত দ্বারা সম্মানিত করবেন:
(১) তাদের প্রতি প্রশান্তি নাজিল হবে।
(২) আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রতি দয়া করবেন।
(৩) ফেরেশতাগণ তাদের চতুষ্পার্শ্বে তাদের সম্মানে দাঁড়িয়ে যায়।
(৪) আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাগণের নিকট তাদের গৌরবের সঙ্গে স্বরণ করেন।
আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন কিছু লোক মহান আল্লাহর ঘরে উপস্থিত হয়ে কোরআন তেলাওয়াত করে এবং পরস্পর পরস্পরকে শিক্ষা দেয় এবং শিক্ষা নেয়, তখন তাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হয়, মহান আল্লাহর রহমত তাদেরকে আবরিত করে রাখে, ফেরেশতারা তাদেরকে ঘিরে রাখে আর আল্লাহ তায়ালা তাদের কথা ওদের নিকট স্বরণ করে যারা তাঁর নিকট আছে, স্বরণ রাখো যার আমল তাকে পেছনে রেখেছে তার বংশ মর্যাদা তাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭০২৮)